#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

‘নেড়ি’- সৈয়দ মিনহাজুল ইসলাম (শিমুল)

শেষ ট্রেনটা ছেড়ে গেছে ঘন্টাখানিক আগে। একটুর জন্যে ধরতে পারেনি সাজিদ। অজো পাড়া গায়ের অখ্যাত এক স্টেশন এই বাজিতপুর। ট্রেন খুব একটা থামেনা এখানে, যাওবা দাঁড়ায় সব লোকাল ট্রেন, দুই এক মিনিটের মধ্যেই আবার ছুটতে শুরু করে। স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অডিট শেষ করতে করতে সাজিদের প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এলো। ৭ টার শেষ লোকালটি ধরা যেতো, কিন্তু বাধ সাধলো গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। আবছা অন্ধকারে তিন মাইল পথ কোনমতে হেঁটে এসে ঠিক স্টেশনের বাইরে পৌঁছে দেখলো ট্রেনটি ছুটতে শুরু করেছে। সাজিদ দৌড় দিয়ে ধরার চেষ্টা করলো ঠিকই কিন্তু প্লাটফর্মে পৌঁছার আগেই ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। অগত্যা প্লাটফর্মের একমাত্র বেঞ্চিকে আপন করে নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করলো সাজিদ।

সমস্ত স্টেশন জুড়ে একটিই মাত্র কক্ষ, তাও তালাবদ্ধ। সাজিদ পরবর্তী ট্রেনের সময় সূচি জানার জন্যে প্লাটফর্মে অনেক ঘুরাঘুরি করেও কাউকে পেলোনা। স্টেশনের বাইরে একমাত্র চায়ের দোকানটি দেখে এগিয়ে গেলো।
দোকানি তার প্রাত্যহিক বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে ঝাঁপি ফেলার পায়তারা করছিলো। সাজিদকে এগিয়ে আসতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো
স্যার কি টেরেন মিস করছেন ?
– জী।
ঢাকা যাইবেন ?
– জী হ্যা।
রাইত একটার আগে আর কোন টেরেন নাই।
– তাই নাকি ? খুব মুশকিল হলো !
কিছু কিনবেন ? আমি দোকান বন্ধ করুম।
– একটু চা হলে মন্দ হতো না ?
চাতো হইবোনা স্যার ! চুলা বুজাইয়া ফালাইছি। অন্যকিছু লন ?
– নাহ, থাক।
সকাল ছয়টার আগে কইলাম আর দোকান খুলুমনা। এইহানে আর কোন দোকান নাই। বিস্কুট, পাউরুটি, কলা, বোতলের পানি লাগলে লইয়া লন ?
– (সাজিদ কিছুক্ষন ভেবে নিয়ে বললো ) আচ্ছা, এক প্যাকেট বিস্কিট আর এক বোতল পানি দিন।
খাবারগুলো নিয়ে এসে প্লাটফর্মের এই বেঞ্চিতে ও বসে পারলো।

কয়েক টুকরো বিস্কিট মুখে দিয়ে সাজিদ আধা বোতল পানি ঢক ঢক করে খেয়ে নিলো। ক্ষিধে লেগেছে প্রচুর। হেডমাস্টার সাহেব অবশ্য বলেছিলেন তার ওখানে রাতের খাবারটা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে। শেষ রাতের ট্রেনটা উনি সাথে করে এসে ধরিয়েও দিয়ে যাবেন বলেছিলেন কিন্তু সাজিদ রাজি হয়নি। এখন মনে হচ্ছে হেডমাস্টার সাহেবের কথা শুনলেই ভালো হতো।

ভাবনার মধ্যে ডুবে ছিলো অনেকটা তাই খেয়াল করেনি সাজিদ যে একটা নেড়ি অনেক্ষন ধরে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কুকুরটার চোখে চোখ পরতেই চমকে উঠলো সাজিদ ! ভয় পাওয়ার মতো এমন কিছুই করেনি কুকুরটি। ৮-১০ হাত দূরে সামনের পা দুটিকে ভাঁজ করে তার উপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে। কোন হিংস্রতা বা পাশবিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা কুকুরটির মধ্যে, বরংচ উল্টোটাই বেশি। ঘরের পোষা কুকুর মনিবকে দেখলে যেমন আদর নিয়ে তাকিয়ে থাকে এবং ঘন ঘন লেজ নাড়ে, অনেকটা সে রকম। এই নির্জন স্টেশনের একাকিত্বের মধ্যে সাজিদ আসলে কাউকেই আশা করেনি। আপন খেয়ালে মগ্ন ছিলো বিধায় লক্ষ্য করেনি কুকুরটি কখন এসে এভাবে বসে আছে, চমকে উঠার কারণ বোধকরি এটাই।

প্রাণী জগতের প্রতি বিদ্বেষ না থাকলেও পোষ্য জীব জন্তুর মোহও কখনো ছিলনা সাজিদের। কুকুরটির উপস্থিতি প্রথমে ভীতি সঞ্চার করলেও আস্তে আস্তে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলো। কুকুরটি যে ওর কোন ক্ষতি করবে না সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই সাজিদ এবার ভালো করে জন্তুটিকে লক্ষ্য করতে লাগলো। স্বাভাবিক নেড়ি যেমনটি হয় ঠিক তেমনি। শীর্ণ দেহ, নোংরা চামড়ার অনেক জায়গায় শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত চিহ্ন। লোম খুব একটা নেই, ডান চোখের উপরে আড়াআড়ি একটা কাটা দাগ কুকুরটিকে সহজেই আলাদা করে। দাগটির দিকে অনেকক্ষন সাজিদ তাকিয়ে রইলো। দেখে মনেহয় ধারালো কিছু একটা চোখটির উপর থেকে নিচে চালানো হয়েছে। অবশ্য রাস্তার নেড়িদের জন্য আঘাত একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। মানুষ থেকে শুরু করে শক্তিশালী সব প্রাণীকূলই ওদের উপর ঝাল মেটায়। সাজিদের কেমন যেনো একটু মায়া হলো কুকুরটার জন্যে। বিস্কিটের প্যাকেট থেকে বের করে একটা ছুড়ে দিলো কুকুরটাকে। কুকুরটাও তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে মুখে নিয়ে চাবাতে শুরু করলো। কুকুরটা ক্ষুধার্ত সন্দেহ নেই। এই নির্জন স্টেশনের আশেপাশে উচ্ছিস্ট খুব একটা পাওয়া যায় বলেওতো মনেহয় না ? সাজিদ প্যাকেটে থাকা বাকি বিস্কিটগুলি ঢেলে দিলো মাটিতে। কুকুরটি আগ্রহ নিয়ে একে একে সবগুলি বিস্কিট শেষ করে মুখ তুলে চাইলো সাজিদের দিকে। সাজিদ বলে উঠলো আর নেই, সব শেষ। কুকুরটি ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে লেজ নাড়লো কতক্ষন, তারপর স্টেশনের অন্য দিকে হাটা ধরলো। সাজিদ দেখলো প্লাটফর্মের ওপর প্রান্তে ছোট্ট একটি ডুবা থেকে কুকুরটি পানি খাচ্ছে। সাজিদের কেমন যেনো একটি ভালোলাগা অনুভূতি হৃদয়ময় ছড়িয়ে যেতে লাগলো। এর আগে ও কখনো কোন পশু পাখির সান্নিধ্যে আসেনি। চিড়িয়াখানা ব্যতিত হাটে মাঠে ঘাটে যে সকল জীব জন্তুর বিচরণ থাকে, ওদেরকে দূর থেকে লক্ষ্য করা ছাড়া আর কোন ধরণের যোগাযোগই হয়নি।

অবসন্ন দেহটি প্লাটফর্মের বেঞ্চিতে কখন এলিয়ে পরেছিলো সাজিদ নিজেও জানেনা ? হঠাৎ কুকুরটির আর্ত চিৎকারে ধরফর করে উঠে বসলো। চারদিকে নিকোষ অন্ধকার। প্রচন্ড বাতাস বইছে। আশাপাশ থেকে কেমন যেনো একটা গো গো আওয়াজ ভেসে আসছে। গা ছম ছম করা অনুভূতি। কুকুরটা তার সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। চোখ কচলে একটু বা দিকে তাকাতেই দেখলো কুকুরটি ওরদিকে পেছন ফিরে
হাত পাঁচেক সামনে অদৃশ্য কিছু একটাকে লক্ষ্য করে সমানে ডেকে যাচ্ছে। এ কোন সাধারণ ডাকা নয় ! মনে হচ্ছে কুকুরটি ভয়ংকর কিছু একটাকে এগুতে দিতে চাচ্ছেনা। সাজিদ কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা। চোখটা রগড়ে নিয়ে আবার ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো। নাহ, কোন প্রাণীর অস্তিত্ত্বতো মিলছেনা ? তাহলে কুকুরটা এমন করছে কেনো ? তাহলেকি এটা পাগল হয়ে গেলো ?
সাজিদ শুনেছে রাস্তার কুকুর নাকি একটা সময়ের পর জলাতংক রোগে আক্ৰান্ত হয়ে উন্মাদ হয়ে পরে ! এটারও কি তাই হলো ? নানান সম্ভাবনা নিয়ে সাজিদ যখন ভেবে যাচ্ছে তখন কি যেনো একটা ওর দৃষ্টিগোচর হলো ? কুকুরটা যেদিকে মুখ করে ডেকে যাচ্ছে ঠিক ওইদিকে একটু উপরে ভালো করে তাকালে কিসের যেনো একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে ? কি একটা যেনো শূন্যে ভাসছে ?
বিশালকায় মনুষ্য আকৃতির ধূসর কি যেনো একটা হাওয়ায় এগুতে গিয়ে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে ? ওটা যতবারই এগুতে চায় কুকুরটি আরো জোরে ডেকে উঠে !
সাথে সাথে অবয়বটি পিছিয়ে যায়। সাজিদের শরীরে শীতল এক অনুভূতি প্রবাহিত হতে লাগলো। ওর ইন্দ্রিয়গুলি এতক্ষন পর ওকে জানান দিচ্ছে যে ও আসলে কি দেখছে ? সাজিদের ঠোঁট দুটি কাঁপছে কিন্তু কোন ধ্বনি বের হচ্ছেনা। সমস্ত দেহ অবশ হয়ে আসছে।
চোখদুটি আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক সময় সব অন্ধকার হয়ে এলো।

এই যে ভাই শুনছেন ? হ্যালো ব্রাদার ? এই যে ?
স্টেশন মাস্টার হুরমুজ আলী এক নাগারে ডেকে যাচ্ছেন।
ভোর পাঁচটায় প্লাটফর্মে এসে সাজিদকে বেঞ্চের উপর পড়ে থাকতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন কোন যাত্রী হয়তোবা শুয়ে আছে। ঘন্টা দুয়েক পরও কোন নড়াচড়া না দেখে সন্দেহ হয়। কাছে এসে ভালো করে তাকাতেই বুঝলেন এতো ঘুমোচ্ছেনা, বেহুস হয়ে আছে ! অনেকক্ষন ধরে ডাকাডাকি করেও কোন লাভ হলোনা। অগত্যা স্টেশন রুম থেকে এক ঘটি পানি নিয়ে এসে চোখে মুখে মারতেই সাজিদ ধরফর করে উঠে বসলো।
কে কে ? স্টেশন মাস্টার বললেন – কি ভাই ! মরার মতো পরে আছেন কেনো ? শরীর খারাপ নাকি ? সাজিদ আমতা আমতা করে বললো – না মানে, কটা বাজে ?
৭টা উত্তর দিলেন মাস্টার। কোথায় যাবেন ? সাজিদ বললো – ঢাকা। মাস্টার বললেন – দুটো ট্রেনতো চলে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠুন। ৬৯ আপ লোকাল এলো বলে। এটা ধরতে না পারলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আর কোন লোকাল নেই। সাজিদ নড়েচড়ে বসলো। নিজেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে স্টেশন মাস্টারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – সেই কুকুরটা ? কুকুরটা কোথায় ?
মাস্টার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে বললেন – কোন কুকুর? সাজিদ বললো – কাল রাতে যেটা ছিলো ? লোম উঠে যাওয়া, ডান চোখে কাটা দাগ ? মাস্টার সন্দেহু দৃষ্টি মেলে বললেন – গত পাঁচ বছরে আমিতো কোন কুকুর দেখিনি এখানে ? সাজিদ কিছু বলতে যাচ্ছিলো এমন সময় দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে এলো। স্টেশন মাস্টার তাড়া দিয়ে বললেন – উঠুন উঠুন, লোকাল এসে গেছে। মাত্র দুই মিনিট দাঁড়াবে। আসুন আমার সাথে টিকেটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

সাজিদ ট্রেনে উঠার সাথে সাথেই ওটা চলতে শুরু করলো। জানালার পাশে বসে মাথাটা বাইরে বের করে স্টেশনের এ মাথা ও মাথা তাকালো কয়েকবার। প্লাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে স্টেশন মাস্টার হুরমুজ আলী সবুজ পতাকা নাড়িয়ে যাচ্ছেন। ট্রেনটা আরেকবার হুইসেল দিয়ে প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলো। সাজিদের চোখদুটি এখনো খুঁজে যাচ্ছে শীর্ণকায় লোম উঠা চোখে কাটা দাগওয়ালা চতুস্পদী জন্তুটিকে যার ভূমিকা গতরাতে অনেকগুলি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ওর মনে? স্বপ্ন না সত্যি এই ভাবনাটাই ধোঁয়াশা হয়ে আছে !

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *