#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ঝুলা .. (রম্য অনুগল্প) ।

সৈয়দ মিনহাজুল ইসলাম (শিমুল) :
হাঁপাতে হাঁপাতে একটি গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন জসিম সাহেব। অর্ধেক জিভ বেরিয়ে এসেছে। ফুসফুস যেনো কোন মতেই মানতে চাইছে না। পঞ্চাশঊর্ধ জসিম সাহেব শেষ কবে প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়ে ছিলেন, ঠিক মনে নেই। আজ মনে হয়েছে যেনো অলিম্পিক স্প্রিন্টকেও উনি হার মানিয়ে দিবেন।

কিভাবে কি হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। আলা ভোলা জসিম সাহেব অত্যন্ত সহজ প্রাণ একজন মানুষ। এই জটিল পৃথিবীতে উনি একমাত্র ব্যক্তি যে অন্যের মন্দ খোঁজা থেকে সম্পূর্ণ বিরত। কেউ একজন তাকে গালি দিলেও উনি হাসি মুখে বলেন ‘ ভাই সাহেব ! এক দুইটা গালিতে কি হবে ? আপনি আরো কয়েকটা দেন, মনে শান্তি পাবেন।’ ওনার স্ত্রী প্রায়ই ভৎসনা করে বলেন, তোমার জন্ম হওয়া উচিত ছিলো মোঘল আমলে। এই বলদ মার্কা স্বভাব নিয়ে খেয়ে পড়ে বেঁচে যেতে। আজকের যুগে তুমি একটা বাতিল মাল। না পারো টাকা রোজগার করতে, না পারো কারো সাথে কথায় পেরে উঠতে। জসিম সাহেব শুধু হাসেন। বলেন গিন্নী, আরো কয়েকটা খারাপ কথা বলো, তোমার প্রেশার নেমে আসবে।

আজকে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে জসিম সাহেব মাছ বাজারে গিয়েছিলেন, যদি ভালো কিছু পাওয়া যায়। মেয়েটা রূপ চাঁদা মাছ খুব পছন্দ করে, আর তার স্ত্রীও রাঁধেন চমৎকার। মাসের মাঝা মাঝি, পয়সা কড়ি তেমন নেই সত্যি, তবে দুই পিস মাছ কেনাই যায়। বাজারে ঢুকতেই পরিচিত সব মাছওয়ালারা ডাকতে শুরু করলো। স্যার, আসেন ভালো ইলিশ আছে। স্যার, গলদা চিংড়ি একটু আগে তুলছি, একেবারে ফেরেস, নিয়ে যান। জসিম সাহেব হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানান। হাসি মুখে জবাব দেন, না ভাই আজকে শুধুই রূপ চাঁদা – আছে ? না পেয়ে উনি এগিয়ে যান।

প্রত্যেকটি বাজারেই উনি খুবই জনপ্রিয়। হাসি মুখে সবার সাথে কথা বলেন বলে নয়, কারণ উনাকে ঠকাতে কোন পরিশ্রম করতে হয়না। চোখের সামনে পঁচা দেখেও শুধু দোকানী কে খুশি করবার জন্যে উনি হাসি মুখে কিনে নেন। এ জন্যে স্ত্রী কাছে কতো কথা শুনতে হয় তার ইয়াত্তা নেই। এরপরও জসিম সাহেব এরকমই। গত কয়েক বছর যাবৎ ওনার কাঁচা বাজারে যাওয়া নিষেধ করে দিয়েছেন তার স্ত্রী, তারপরও সুযোগ পেলে জসিম সাহেব ঢুকে পড়েন।

যাই হউক, আজ রূপ চাঁদা খোঁজতে খোঁজতে না পেয়ে শেষে করিম মিয়ার দারস্ত হলেন। করিম মিয়া একজন মাছ বিক্রেতা হলেও তার স্বভাব প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত !
সে সপ্তাহে তিনদিন মাছ বিক্রি করে আর বাকি চার দিন ভ্যান চালায়। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘হারাদিন বইয়া মাছ বেইচ্চা সইলে খিল ধইরা যায়, এক লাইগ্গা ভ্যান টাইন্না শরিলডারে ঠিক রাখি।’ কথা সত্য, কিন্তু অন্যের চোখে সে পাগলাটে। করিম মিয়ার আজকে শেষ দিন মাছ বিক্রির। কালকে থেকে সে ভ্যান টানবে। বাজারের শেষ মাথায় ছোট্ট একফালি জায়গায় বসেছে করিম মিয়া তার মাছের পসার নিয়ে। এগিয়ে যেতেই চোখে পড়লো একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা কি এক মাছের দাম নিয়ে করিম মিয়ার সাথে দরাদরি করছেন। ভদ্রমহিলার হাতে অনেকগুলি বাজারের ব্যাগ। কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলানো, দেখে সাধারণ লেডিস ব্যাগ বলে মনে হয় না, অনেকটা উঠতি কবিরা যে রকম ঝুলা নিয়ে ঘুরে সে রকম। মনে হচ্ছে পাটের তৈরী। উপরে কারুকাজ করা এবং হাতলটা একটু ছোট। মহিলা দেখতে খুব স্বাস্থ্যবতি। চিরায়িত বাঙালি রমণীরা যেমন হয়। একটা বয়সে এসে দেহের চতুর্দিকে মেদের প্রাচুর্যতা দেখা দেয়। অনেকে একে মুটিয়ে যাওয়া বলে, তবে জসিম সাহেব মানতে নারাজ। তিনি বলেন, এটা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের লক্ষণ। ভদ্রমহিলা যেভাবে দেহ কাঁপিয়ে দর দাম করে যাচ্ছেন, এতে জসিম সাহেবের একটু ভয়ই হলো। উত্তেজনার চোটে যদি বে-খেয়ালে এক আধটা হাত করিম মিয়ার উপর পড়ে তো আর রক্ষে নেই। ভদ্রমহিলার একেকটা হাতের প্রশস্তি রুগ্ন করিম মিয়ার উরু থেকেও বড় হবে !

দরদামের মধ্যিখানে করিম মিয়া কপালে হাত ঠেকিয়ে জসিম সাহেবকে দেখে সালাম দিলো। জসিম সাহেবও তার চিরাচায়িত নিয়মে সব কটি দাঁত বের করে নিঃশব্দে হেঁসে উত্তর দিলেন। ভদ্রমহিলা মাটিতে রাখা আরেকটি ব্যাগে সদ্য কেনা মাছগুলি ভরে রাখবার জন্যে উবু হলেন। জসিম সাহেব একটু পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি খেয়াল করলেন যে, ভদ্রমহিলার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগটি হাড়ের সন্ধিস্থল থেকে হাতের দিকে পিছলে নেমে আসছে। উনি তাড়াতাড়ি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন ‘এক্সকিউজ মি ম্যাডাম, আপনার ঝুলাটা বেরিয়ে আসছে।’ ভদ্রমহিলা চকিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। পিছনে ফিরে জসিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে দেখলেন উনি মিটিমিটি হেসে চোখের ইশারায় কি যেনো দেখাচ্ছেন। ভদ্রমহিলা কি বুঝলেন কে জানে ? চট করে শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে অগ্নি দৃষ্টি মেলে তাকালেন জসিম সাহেবের দিকে। এরপর বজ্র হুঙ্কার ছেড়ে বললেন ‘কি বললি হারামজাদা শুয়োর ? তোর এতো বড় সাহস !’ এই বলে ভদ্রমহিলা তার কাঁধের ব্যাগটি হাতে নিয়ে হাতলটি মুষ্টিবদ্ধ করে মাথার উপর তুলে ধরলেন। ঘটনা কি ঘটতে যাচ্ছে টের পেয়ে করিম মিয়া চিৎকার করে বলে উঠলো ‘ স্যার ! দৌড় লাগান’ ।জসিম সাহেব কিছুটা হতচকিয়ে গেলেন, কিন্তু হাসিটা এখনো মুখে লেগে আছে। করিম মিয়া আবারো চিৎকার করে কিছু একটা বলতে উদ্যত হওয়ার আগেই ভদ্রমহিলা তার ব্যাগটি ধড়াম করে বসিয়ে দিলেন জসিম সাহেবের মাথায়। মাথায় প্রচন্ড বারি খেয়ে জসিম সাহেব মাগো বলে আর্তনাদ করে উঠলেন। এরপর কি ঘটেছে উনি ঠিক মনে করতে পারছেন না। যখন সংবিৎ ফিরে পেয়েছেন তখন উনি মাঝ রাস্তায় পাগলা হাতির মতো দৌড়াচ্ছেন। প্রায় মাইলখানিক দৌড়ে এসে বড় রাস্তার ধারে একটি গাছ দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে হাপাচ্ছেন।
১০-১৫ মিনিট পর যখন তার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলো, তখন নিজেকে নিজে বললেন ‘ ভদ্রমহিলার মনটা মনে হয় আজ ভালো নেই ? আহা বেচারী ….’ ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *