“জাহেদার যুদ্ধ” – শামীমা এম রিতু |
এক.
শ্রাবণের রাতের অাকাশ, কিন্তু ধবধবে পরিষ্কার।চাঁদের আলোয় যেন পৃথিবী দুলছে; দূরে কয়েকটি তারা যেনো জ্বলতে জ্বলতে ক্লান্ত। বড় উঠোনের কোণে একটা ঘর। পুরনো আমলের পাকা,কিন্তু এখন অবস্থা জরাজীর্ণ। তারই বারান্দায় মাদুর পেতে ছয় বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে জাহেদা বসে আছে । পৃথিবীর এই অপরূপ দৃশ্য যেন তাকে স্পর্শই করছে না; এমন রূপে কে নির্বিকার থাকে পাথরের মত!
– আম্মা ও আম্মা !
উসখো খোসকো চুলে জাহেদার দশ বছরের মেয়ে দিবা এসে ডাক দিলো।মায়ের এই নির্বিকার রূপে সে এমনিতেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। অবশ্য কয়েকদিন ধরে যা ঘটছে তাতে দশ বছরের দিবা এমনিতেই বুঝে গেছে যে পৃথিবী কতটা কঠিন। তার পরিবারে বড় কিছু হতে চলেছে সেটা ও বুঝে নিয়েছিলো।তাই মাকে বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। জাহেদা যেন তবু নির্বিকার। রাতের পাখিরা ডাকছে,উঠোনের কোনের হাস্নাহেনার সুবাসে আকাশ বাতাস পুলকিত; প্রকৃতি কিংবা পৃথিবীর কারো জাহেদার চোখের পানি দেখার সময় নেই। কিন্তু জাহেদা স্তব্ধ ; পাহাড়ের বুক ছিড়ে ঝর্ণা ধারা বয়ে যাবার সময় যেভাবে পাহাড় স্থির থাকে, আনন্দে তার বুকে ঝর্ণাকে নৃত্য করায় তেমনি জাহেদার অশ্রুও যেনো তার বুক ফাটা আনন্দের আর্তনাদ ।সে আনন্দ কাঁদতে পারার আনন্দ !
দুই.
চৌদ্দ বছর আগে জাহেদাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলো মানিক।মানিকের দেয়া বিয়ের প্রস্তাব আর তাতে জাহেদার স্বতস্ফূর্ত সম্মতি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো জাহেদার জীবনে।প্রথমে সংসারে অল্প সুখ বিরাজ করলেও প্রথম সন্তান কন্যা হওয়ায় পরিবারের ‘লক্ষী’ বৌটি সহজেই ‘অলক্ষী’ হয়ে গেল।প্রবাসী স্বামীর পরিবারে সে দিন দিন অবহেলিত হতে লাগলো। সে বুঝতে পারে, এ সমাজে বিয়েতে মেয়েদের কখনই সরাসরি সম্মতি দিতে নেই!কেননা, পরে অাপনজনরাই বলে – “তুই তো বিয়েতে মত দিলি “! জাহেদা ভাবে, নারী নির্যাতন তো নারীরাই করছে,তাহলে পুরুষদের দোষ দেয়া হয় কেন? ওর স্বামী দেশে নেই, সে তো তাকে মারছেনা। কয়দিন ধরে শ্বাশুড়ি আর ননদই তো ওকে মারলো! প্রতিনিয়ত অত্যাচার করে ওরাই স্বামীর কাছে মিথ্যা বদনাম রটালো!এসব চিন্তার সাথে সাথে ওর অনেক ভাবনায় পরিবর্তন আসতে লাগলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলো- আমি কেন মরছিনা!
কোলের উপর শুয়ে থাকা ছয় বছরের ছেলেটির পাশ ফেরার কারনে তার চেতন হলো! অবাক চোখে তাকালো!কি সুন্দর নিষ্পাপ শিশুটা ঘুমিয়ে আছে ! ওকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে শুধু এই দুটি নিষ্পাপ মুখের দিতে চেয়ে! মা হওয়া আসলে যতটা কঠিন,মা হয়ে বেঁচে থাকা আরো বেশি কঠিন।এই সন্তানের মায়ায় তাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখছে ।মা – এ কারনেই হয়ত পৃথিবীর সব থেকে ভারী শব্দ!
রাত গভীর হচ্ছে, জাহেদা দেখলো পাশের আম গাছের কুঠর থেকে একটি পেঁচা অদ্ভূত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে । তার গোড়াতে বসে পোষা কুকুর দুটি ঝিমুচ্ছে। বাতাস বইছে মৃদু তালে অদ্ভূত শক্তি যেনো জাহেদাকে স্পর্শ করে গেলো! সে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল –
” আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, পৃথিবীতে সবাই বেঁচে চলেছে প্রকৃতির নিয়মে, আমিও সে নিয়মের বাইরে নই! আমি প্রকৃতিরই একজন! এ পৃথিবীতে আমারও অধিকার আছে নিজের মত থাকার। আমি কারো কাছে কিছুই না কিন্তু আমার দুটি সন্তানের কাছে দুটি পৃথিবী! ”
যখনি মাদুরের দিকে তাকালো দেখলো দিবা চেয়ে আছে । দশবছরের মেয়েটা দুইদিনেই যেনো অনেক বড় হয়ে গেছে। মাকে জড়িয়ে ধরে বললো- “মা কেঁদনা, কয়েকটা বছর অপেক্ষা করো, আমি তোমাকে লালন করবো আমার মাঝে! তোমাকে কাঁদতে হবেনা । আমার জন্ম তোমার জীবনের অভিশাপ ছিলো কিন্তু আমি সেটাকে আশীর্বাদে পরিণত করবো” তুমি অপেক্ষা করো মা!
মেয়ের কথাতে যেনো জাহেদা অবাক হলো, তার দশ বছরের হাবা মেয়েটা কেমন করে এতটা বুঝতে পারলো সেটাই তাকে স্মব্ধ করে দিলেও মনে যেন নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পেলো। ভুলে গেলো সকল অত্যাচার,অসুস্থতা! যারা মুখে মুখে বড় বড় কথা বলে,উন্নতির বানী শোনায় তারাই কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার অপরাধে অকথ্য নির্যাতন করেছিল জাহেদার উপর। কত স্বপ্ন, কত আশায় সে ঘর বেঁধেছিল প্রিয় মানুষটির সাথে।সময়ের সাথে সাথে সেও বদলে গেল,কর্পূরের মত উবে গেল সকল ভালবাসা,সোনালী ফিতায়, লাল শাড়িতে যে স্বপ্ন মেয়েরা দেখে তার বেশির ভাগই বাস্তবে পরিণত হয়না। জাহেদার মত গ্রাম্য, সরল, অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মেয়েরা মরে গেলেও তাকে স্বামীর বাড়িতে থাকতে হয়।প্রতিবাদ সেখানে নিষিদ্ধ! এমন জীবন অার জাহেদা চায়না। তাই মেয়ের মাঝেই সে নিজেকে দেখতে চায়!পূর্ণ করতে চায় নিজের স্বপ্ন গুলোকে।সে চায়না তার মেয়েও তার মত হোক। দিবার মাঝেই সে দিব্যলোকের আলো দেখে। সে আলোর আশায় কখন যে মাদুরে তার চোখ মুজেছিলো বলতে পারেনা।প্রকৃতি তার মতই যামিনী কাটাতে থাকে ….
তিন.
ভোর হলো।সে ও তো প্রকৃতির নিয়ম। তবে ভোরটা ছিল নতুন।জাহেদা নতুন জীবনের আলো দেখে সেই ভোরের রেখায়।অনেক দূরের সে আলো পেতে হলে তাকে লড়াই করতে হবে – সমাজের সাথে, পরিবারের সাথে। যে লড়াইয়ে সে কাউকে পাশে পাবেনা। এতটা বছরে সে ভালভাবেই বুঝে গিয়েছে মেয়েরা বিয়ে হলেই পর হয়ে যায়,বোনের বিয়ে দিয়ে দিলেই ভাইয়ের দায়িত্ব ঘুচে যায়,ভাইয়ের সংসারে আর স্থান হয় না! পিতার মৃত্যুর পর জন্মবাড়িটি মেয়েদের চিরতরে পর হয়ে যায়,কোন কারনে বেড়াতে এলে আশ্রিতার মত যাপন করতে করতে হয় অতিথিকাল।
জাহেদা চুপচাপ দরজা খোলে কলপাড়ে গেল।গায়ে অনেক পানি ঢেলে গোসল করলো।দিবাকে তুলে গোসল করিয়ে ভাল জামা পরালো। ছেলেটাকেও জামা পরিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললো -“তুমি চিরায়ত নিয়মে চলতে থাকো, আমি নিয়ম ভাংতে নয় গড়তে চললাম, যুদ্ধটা এবার নিজের সাথেই করবো তবে তোমাদের বিরুদ্ধে নয়, শিক্ষা দিতে। আমার জায়গাতে দাঁড়িয়েই আমি সেই যুদ্ধ জয় করবো, তোমাদের জরাজীর্ণ সতীদাহের যূপকাষ্টে জ্যান্ত বলি অামি হতে চাই না, আমি চাইনা আমার দিবাও কখনো সেই বলি হোক “।
শ্রাবণের বৃষ্টিহীন দিন। রোদেলা আভায় চকচক করছে কচি ধানের শীষ।মাথার উপর দিয়ে মুক্ত পাখিরা ডানা মেলে উড়ছে, কয়েকটা ঘুঘু খাবার খোঁজছে, অনেকগুলো সাদা বক ধান ক্ষেতের মাঝে ঋষির মত একঠেঙে দাঁড়িয়ে আছে । সেই সবুজ ঘাষে ঘেরা কাঁদামাটির পথে দুই হাতে দুই পৃথিবী ধরে জাহেদা অনন্য মনোবলে এগিয়ে চলছে নারী জীবনের সংগ্রামে জয়ী হবার যুদ্ধে। তাদের কারো পা থেমে নেই,দিবার চোখে শুধু আগুন ; সে আগুনে জ্বালিয়ে দিতে চায় সমাজের সমস্ত কুসংস্কার।একেক পা ফেলে সামনে আগায় আর মায়ের হাত শক্ত করে ধরে দিবা মনে মনে বলে আমাদের পারতে হবে মা….





