#সাহিত্য ও সংস্কৃতি

‘চারুলতা’ – সৈয়দ মিনহাজুল ইসলাম (শিমুল) ।

বাসটা মিস না করলে আরো ঘন্টা দুয়েক আগেই এসে পৌছাতাম, মনে মনে বললো অনিক। অচেনা জায়গা, তার উপর অজ পাড়া গাঁ ! কিভাবে পৌঁছবো কে জানে ?
তমালদের সাথে আসলেই ভালো হতো। ওরা সবাই দল বেঁধে এসেছে দুই দিন আগে। সুদীপ্তার দিদির বিয়ে। ওদের বাড়ির প্রথম বিয়ে, তাই খুব ধুম ধাম হবে বলে জানিয়েছে সুদীপ্তা। ওদের পূর্ব পুরুষ এককালে জমিদার ছিলো। এখন অবশ্য জমিদারী নেই, তবে জমিদার বাড়ির ভগ্নাদেশের কিছুটা রয়ে গেছে। সুদীপ্তার ঠাকুরদার আমল পর্যন্ত বাড়িখানা সাবেকি হাল কিছুটা ধরে রেখেছিলো, তার পর আর কেউ তেমন তোয়াক্কা করেনি। অবশ্য অবস্থাও ছিলো না। সুদীপ্তাদের বাবা জেঠু মিলিয়ে দুই ভাই আর আছেন দুই পিসি। ওর জেঠু ষাটের দশকে কলকাতায় পড়াশুনা করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। জেঠাতো ভাই বোনদের সাথে কখনো যোগাযোগ হয়নি আর ওরাও আসেনি। পিসি দুজনের বিয়ে হয়েছে আশে পাশের গ্রামেই। পিসে মশাইদের বড় গৃহস্তী, অবস্থা ভালই। সুদীপ্তার বাবা পৈতৃক জমি জমা যা পেয়েছিলেন, তা বাড়িয়ে চড়িয়ে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। তার উপর গঞ্জে ওদের বিরাট বড় কাপড়ের দোকান ও একটি রাইস মিল। সুদীপ্তার বাবা অনেক করে সবাইকে বলেছেন তার বড় মেয়ে নীলিমার বিয়েতে অবশ্যই যেতে হবে। শুধু গেলে হবেনা, এক সপ্তাহ আগে গিয়ে থেকে দিদির বিদায়ের সমস্ত আয়োজনে হাত লাগাতে হবে। অনিক মানা করতে পারলো না। ব্যাচের সবাই যাচ্ছে, ও একা মানা করে কি করে ? তাছাড়া গ্রামের হিন্দু বিয়ে এর আগে ও কখনো দেখেনি। এক সুযোগে সব দেখা হয়ে যাবে। অবশ্য, এক সপ্তাহ আগে কারোরই যাওয়া হয়নি শুধু সুদীপ্তা ছাড়া। বাকীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বিয়ের দুদিন আগে যাবে দল বেঁধে। অনিক পারলোনা ওর এসাইনমেন্টের জন্যে। সারারাত ধরে এসাইনমেন্ট করে সকালে প্রিন্ট দিয়ে গিয়ে দেখে প্রিন্টারে কালি নেই। আর এতো ভোরে কোন দোকানও খুলবেনা। ওর ইচ্ছে ছিলো এসাইনমেন্টা ভার্সিটিতে জমা দিয়ে সোজা বাসে উঠবে। বাসে কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিয়ে সোজা বকুলপুর। সে ইচ্ছায় গুড়ে বালি ! ল্যাপটপটা নামিয়ে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবছে কি করা যায় ? ঐ ভাবনার মধ্যেই কখন যে চোখ লেগে গেছে, টের পায়নি। যখন ঘুম ভাঙলো তখন বেলা তিনটা বেজে গেছে। লাফ দিয়ে উঠে পড়ি মরি করে ছুটলো সাইবার ক্যাফেতে। এসাইনমেন্ট প্রিন্ট করে স্পাইরাল বাইন্ডিং করে ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে দিতে বিকেল পাঁচটা বেজে গেলো। সেখান থেকে ছুটলো বাসস্ট্যান্ডে।
সুদীপ্তা বলে দিয়েছিলো সাতটার পর আর কোন বাস পাওয়া যায়না। অনিক সাড়ে ছয়টার বাসটা ধরতে পারতো, কিন্তু জ্যামের কারণে মিস হয়ে গেলো। যাকগে, শেষ বাসটাতো ধরা গেলো। এরমধ্যে বন্ধুদের কাছ থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশটা মিস কল এসেছে ! ও ইচ্ছে করেই ধরেনি। কারণ, ও জানে ও যাই বলুক বকা ওকে খেতেই হবে। তাই ভাবলো, একেবারে সামনে গিয়েই খাক।

বাসটা মতিগঞ্জে নামিয়ে দিলো। সুদীপ্তা বলেছিলো, মতিগঞ্জ থেকে ওদের বাড়ি দুই কিলোমিটার। গ্রামের মধ্যে দিয়ে ইট বিছানো রাস্তা। রিক্সা ভ্যানে করে আধ ঘন্টা সময় লাগে। বকুলপুর জমিদার বাড়ি বললে ভ্যান চালক একেবারে বাড়ি পৌঁছে দেবে। কিন্তু অনিক অনেক্ষন অপেক্ষা করেও কোন রিক্সা ভ্যান দেখতে পেলো না। অগত্যা বাসস্ট্যান্ডের পাশের এক চা বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলো কি করা যায় ? লোকটা বললো, আজকে আর কোন ভ্যান পাইবেন না। চরণতলীর মাঠে যাত্রা পালা আইসে। সবগুলান ওই হানে গেছে। আপনে এক কাম করেন, ওই যে ইটের রাস্তাডা দেহা যায়, ওইডা ধইরা হাঁটা ধরেন। অর্ধেক রাস্তায় গিয়া তিন রাস্তার মোড় পাইবেন, আপনে বামের রাস্তা ধইরা আউগাইলেই কিছুদূর পর আইবো বকুলপুর।
ওইহানে গিয়া যে কেউরে জিগাইলেই দেহায়া দিবো জমিদার বাড়ি।

অনিক আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটা ধরলো। কাঁধে ওর ছোট্ট একটা ট্র্যাভেল ব্যাগ, হাঁটতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছেনা। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। ইটের সলিং দেয়া রাস্তা। দুপাশে ধান ক্ষেত। রাস্তার এখানে ওখানে দুই একটা ইট খোয়া গেছে। কোন কোন জায়গায় ইটগুলি আলগা হয়ে আছে, অনিক তেমনি একটায় পা দিয়ে হুঁচোট খেতে খেতে বেঁচে গেলো। রাস্তায় কোন বাতির ব্যবস্থা নেই। আকাশ মেঘলা না হলেও চাঁদের তেমন দেখা নেই। ঘুট ঘুটে অন্ধকার নয় অবশ্য, ঝাঁপসা দেখা যাচ্ছে চারিধার। অনিক হাঁটতে হাঁটতে তিন রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছালো। যাক, তাহলে ঠিক পথেই যাচ্ছি, মনে মনে বললো অনিক। এরপর আরো মিনিট কুড়ি হেঁটে বসতির দেখা পেলো অনিক। মনে হচ্ছে বকুলপুর এসে গেছি, এখন বাড়িটা খোঁজে বের করতে হবে।

চারিদিকে তাকিয়ে কোন জন মানব দেখতে পেলো না অনিক। আচ্ছা মুশকিল হলোতো ? এখানেতো নাম্বারও নেই যে নিজে খোঁজে বের করবো? মাথাটা চতুর্দিকে ঘুরিয়ে অনিক বুঝার চেষ্ঠা করছে কোন দিকে যাবে, এমন সময় শুনতে পেলো সরু কিন্নর কণ্ঠে কে যেনো বলে উঠলো, দাদা ! কই যাইবেন ? অনিক পিছন ফিরে তাকাতে দেখলো, ১৫-১৬ বছরের এক কিশোরী তার থেকে হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাঁসছে। আবছা আলোয় মুখটা পরিষ্কার দেখা না গেলেও, বুঝা যায় বেশ পরিপাটি করে শাড়ি পড়া গ্রাম্য কিশোরী, মাথার দুই দিকে বিনি করে লাল ফিতে লাগেনো, নাকে নথ দেয়া খুব সম্ভবত রুপোর হবে তাই এই আবছা অন্ধকারেও ঝিলিক দিচ্ছে। কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে হবে নিশ্চই ? কিন্তু এই রাতের বেলা একা এখানে কি করছে ? অনিক থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেললো, আপনি মানে তুমি এতো রাতে ঘরের বাইরে একা কি করো ? মেয়েটি হেসে বললো, জোৎস্না দেখি। জোৎস্না ! অনিক বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইলো ? মেয়েটি আবার বললো, হ জোৎস্না। অনিক চারিদিকে তাকিয়ে বললো, কই জোৎস্না ? আমিতো দেখি শুধু অন্ধকার। মেয়েটি বললো, আপনে পাইবেন না। ওরা খালি আমারে দেখা দেয়। অনিক জানতে চাইলো, কেন শুধু তোমাকে দেখা দেয় কেনো ? মেয়েটি হেসে বললো, আমি যে ওদের সই !
অনিক বললো, অদ্ভুত ! আচ্ছা তুমি যে এতো রাতে বের হয়েছো, তোমার বাবা মা কিছু বললে না ? মেয়েটি বললো, নাহ আমি লুকাইয়া বার হই। অনিক বললো, খুব দস্যি মেয়েতো তুমি ! তোমার ভয় করেনা ? মেয়েটি বললো, ডর ! ডর করবো কেন ? অনিক বললো, কেনো সাপ খোপ থাকতে পারে, ভূত থাকতে পারে ? মেয়েটি এবার জোরে হেসে উঠলো, ভূত ! কথাটি বলে আবার হাসতে লাগলো। ভূতে আমারে কিছু করেনা। অনিক ব্যঙ্গ করে বললো, কেনো ? ওরাও তোমার সই নাকি ?
মেয়েটি এবার হাঁসি থামিয়ে বললো, নাহ ! ওরা আমারে চিনে। অনিক বললো, যা বাব্বা ! ভূতেরা তোমাকে চেনে ? তুমি ওদের সাথে খেলা করো নাকি ? মেয়েটা আর কিছু বললো না, শুধু হাসলো। তারপর বললো, কইলেন না কই যাইবেন ? অনিক যেনো সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললো, ও আচ্ছা হে, ভুলেই গিয়েছিলাম। জমিদার বাড়ি। মেয়েটি বললো, জমিদার বাড়ি ? নীলিমা দিদিগো বাড়ি ? অনিক বললো, হে হে ওদেরই বাড়ি। তুমি চেনো ? মেয়েটি বললো, ওমা ! জমিদার বাড়ি কে না চিনে ? নীলিমা দিদি আপনার কে হয় ? অনিক বললো, আমার কেউ নন। তবে উনার বোন সুদীপ্তা আমার ক্লাসমেট। মেয়েটি বললো, ক্লাসমেট কি ?
অনিক উত্তর দিলো, মানে আমরা একসাথে পড়ি। মেয়েটি বললো, ও আইচ্ছা। নীলিমা দিদিরতো আইজ রাইতে বিয়া ? অনিক বললো, হে হে তাইতো যাচ্ছি। আমাকে একটু চিনিয়ে দিবে বাড়িটা ? মেয়েটি বললো, আসেন আমার লগে।

ওরা দুজনে হাঁটতে শুরু করলো। মেয়েটা অনিকের থেকে ঠিক দশ বারো হাত সামনে চলছে। ঠিক সরাসরি সামনে নয়, আড়াআড়ি ভাবে ৪৫ ডিগ্রী কোন নিয়ে এগিয়ে। অনিক ভাবলো, অদ্ভুততো ! মেয়েটা কাছে না এসে ঠিক একই দুরত্ত বজায় রেখে সামনে চলছে। গুন্ গুন্ করে কি যেনো একটা গান গাইছে মেয়েটা হাঁটতে হাঁটতে। হঠাৎ বলে উঠলো মেয়েটি, আচ্ছা আপনে ভূত বিশ্বাস করেন ? অনিক হেঁসে বললো, তুমিকি আমাকে ভয় দেখানোর মতলব করছো ? ছোট বেলায় আমার ভাই বোনরাও এমন করতো। মেয়েটা না হেসেই বললো, না আমি আপনারে ডর দেখাইতে চাই নাই, জানতে চাইছি ?
অনিক বললো, ছোটবেলায় অনেক গল্প শুনেছি। কখনো চোখে দেখিনি। বিশ্বাস /অবিশ্বাসের মাঝা মাঝিতে আছি। কেনো বলতো ? মেয়েটি বেশ গম্ভীর ভাবেই বললো, এমনেই জানতে চাইলাম। মাইনসে যে কেন ভূতেরে এতো ভয় পায় ? অনিক বললো, কেনো তুমি পাওনা ? ও আচ্ছা, তোমারতো আবার ভূতের সাথে জানা শুনা, কথাটা বলেই অনিক হাসতে লাগলো। হাসিটা থেমে আসতেই ওর কানে ভেসে এলো ঢোল আর শাঁকের আওয়াজ। তার সাথে শুনতে পেলো অনেকগুলি নারী পুরুষের হর্ষ ধ্বনি। মেয়েটি ইশারায় দূরে আলোক সজ্জিত একটি পুরোনো আমলের বাড়ি দেখিয়ে দিয়ে বললো, ওইটাই নীলিমা দিদিগোর বাড়ি।
অনিক বাহারি সাজে সজ্জিত সাবেকি জমিদার বাড়িটিকে কিছুক্ষন মুগ্দ্ধ হয়ে দেখে নিয়ে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখে, সে নেই ! আরে মেয়েটি গেলো কোথায় ? এইতো এখানে ছিলো ? অনিক চারদিকে মাথা ঘুরিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় দেখার চেষ্ঠা করলো, নাহ কোথাও নেই। কি আশ্চর্য মেয়ে ! এতদূর একসাথে এলো, অথচ যাওয়ার সময় বলে গেলো না ? যাকগে, অনিক হাঁটা ধরলো।

ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির প্রধান ফটোকটি ভেঙে গেলেও মর্যাদা হারায়নি। অনিক ফটোকটি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই সুদীপ্তা দেখতে পেয়ে দৌড়ে এলো, কিরে গাধা ? এই তর আসার সময় হলো ? অনিক পুরো বিস্তারিত বলে নিয়ে যুক্ত করলো, কি অদ্ভুত মেয়েটা ? নামটা পর্যন্ত বলে গেলো না ? সুদীপ্তা সব শুনে নিয়ে চোখ মুখ টান টান করে বললো, চারুলতা। ওর নাম চারুলতা।
অনিক বললো, চারুলতা ? কে এই চারুলতা ?
সুদীপ্তা ঠান্ডা গলায় বললো, তুই জল দিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে নে। আজ নয় অন্য আরেকদিন বলবো কে ছিলো চারুলতা। অনিক প্রথমে বুঝতে পারলো না। আস্তে আস্তে ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো অস্ফুস্ট স্বরে বললো, চারুলতা ছিলো …. তারমানে. …..!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *