অনুগল্প।
‘সজিবের তমা !’
– সৈয়দ মিনহাজুল ইসলাম (শিমুল) ।
ঐ যে দেখছেন, বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে , ওর নাম তমালিকা, আমি ডাকি তমা বলে। আমার ছয় বছরের জীবন সঙ্গিনী। দিনের মধ্যে কমপক্ষে আট ঘন্টা ও ওখানে বসে দোল খায়। কাজ কর্ম নেই তো, কি আর করবে বেচারী ? প্রায় বছরখানিক হলো ওর চাকরী চলে গেছে। দ্বিতীয় সারির একটা বেসরকারী ব্যাংকে চাকরী করতো। রিসেপশনে বসে সারাদিন কাস্টমারদেরকে হ্যালো স্যার, কিভাবে সাহায্য করতে পারি ইত্যাদি বলে বলে মুখে ফেনা তুলতো। খুব একটা এনজয় করতো তা না, কিন্তু দায়িত্ব কম ছিলো বিধায় গা করতো না। গত বছর করোনা মহামারির কারণে ওদের পুরো ব্রাঞ্চটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
সেই থেকে বেকার বসে আছে। চাকরীর চেষ্টা করেছিলো দুই একটা, কিন্তু দায়িত্বের বহর জেনে আর এগুইনি। আলসের এক শেষ ! এখন সারাদিন বসে বসে ফেসবুকে
বিভিন্ন প্রোডাক্টের রিভিউ দেখে আর ইমোজি ছাড়ে। কমেন্টসও দেয় না, ওই যে আলসেমী।
এবার আমার কথা বলি। আমি সজিব। নামকরা একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে অংক পড়াই, মানে পড়াতাম। এক বছর যাবৎ স্কুল বন্ধ। তবে বেতন বন্ধ হয়নি, কিছুটা কমেছে। এইসব স্কুলের অভিভাবকরা সব রুই কাতলা। ছেলে মেয়ে স্কুলে গেলো কি না গেলো, তা নিয়ে এদের মাথা ব্যথা নেই। তবে রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু ঠিকই প্রশ্ন করতে ভুলেন না। সরাসরি প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে কৈফিয়ত চেয়ে বসেন, কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালছি, ছেলের রেজাল্ট খারাপ হয় কেন ? প্রিন্সিপাল কাচুমাচু হয়ে বলেন, চিন্তা করবেন না স্যার, আপনার ছেলের জন্যে স্পেশাল টিউশনের ব্যবস্থা করছি। এরপর যে বিষয়ে ফেল করেছে, সেই টিচারকে ডেকে মার্জিত ভাষায় চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করবেন ! যেন টিচারের ভুলেই ছাত্রের এই অবস্থা। ভালো বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে কোন টিচারই মুখ খুলেন না।
বলতে সাহস পান না যে, এই বাঁদরগুলো ক্লাসে বসে পাবাজী খেলে। হোমওয়ার্ক দিলে বলে টাইম পায়নি। ক্লাসে বসেই ছেলে মেয়েগুলি একটা আরেকটাকে এডাল্ট জোক পাঠায়। কিছু বলতে গেলেই কমপ্লেইন চলে যায় স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার অফিসারের কাছে। মহা যন্ত্রনা ! টিচাররা পারলে হাতজোড় করে পড়ায়। তবে যাই হউক, বেতন দিতে এরা কখনো ভুলে না।
গত আট মাস ধরে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছি। সামনে বসিয়েই কিছু শিখাতে পারি না তো অনলাইনে কি হচ্ছে বুঝতেই পারছেন ? আমি এক নাগাড়ে দুই ঘন্টা বকে যাই আর ওরা ভিডিও অফ করে শুনে। কি শুনে তা ওরাই জানে।
তমা এখনো দোল খেয়ে যাচ্ছে। আমি চা খাবো। ও খাবে কিনা তাই জিজ্ঞেস করতে বেলকনিতে আসা। ও উত্তরে কি বলবে, তা আগে থেকে অনুমান করার কোন জো নেই। সব নির্ভর করে ওর মুডের উপর। আবার মুখ দেখেও ওর মুড বলে দেওয়ার সাধ্য কোন জ্যোতিষ মহারাজেরও নেই। দেখা গেল ও খুব শান্ত হয়ে বসে আছে, জিজ্ঞেস করলাম কি গো চা খাবে ? ও খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দিবে, এখন কী চা খাওয়ার সময় ? কী জ্বালা ? সরাসরি বললেই তো হয়, খাব না। আর যদি একা একা খেয়ে ফেলি তো বলবে, শুধু নিজের জন্যেই বানালে ? তাই আর ঝুঁকি নেই না।
আমাদের ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে তৃতীয় পক্ষের আগমন এখনো ঘটেনি। অর্থাৎ, সন্তান এখনো আসেনি। প্রক্রিয়াধীন আছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। এতে আমাদের তেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না, তবে উভয় পক্ষের মুরুব্বিদের ভ্রূকুটি দেখতে হচ্ছে নিত্যই। একবার তমা এসে বললো, এই শুনো – তোমার ছোটখালা খুব বিরক্ত করছেন। প্রায়ই আমাকে ফোন করে কোথাকার কোন বাবার তাবিজ কবজ নিতে বলছেন। আরো বলেছেন তোমাকে খরগোশের মাংস খাওয়াতে, এতে নাকি তোমার শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, তুমি কি বললে ? তমা উত্তর দিলো, আমি বলেছি খরগোশে কাজ হবে না, সজিবকে গন্ডারের শিংয়ের স্যুপ খাওয়াতে হবে। আমি জানতে চাইলাম, ছোটখালা কি বললেন ? তমার উত্তর দিলো, খটাশ করে লাইনটা কেঁটে দিলেন। আমি ভাবলাম আমাদেরতো ল্যান্ডফোন নেই, খটাশ করে লাইনটা কাটলো কিভাবে ? যাগ্গে, জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, উত্তরে আবার কি না কি বলে।
আমাদের দাম্পত্য জীবনটা খুব স্বাভাবিক। একটু বেশি মাত্রায়ই স্বাভাবিক। এই যেমন, আমরা খুব একটা ঘুরতে যাই না, ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবি না, কেউ কারো মোবাইল চেক করি না, দাম্পত্য কলহ নেই বললেই চলে। আসলে ঝগড়া হবে কী নিয়ে ? দাম্পত্য কলহের মূল উপাদান হচ্ছে সন্দেহ। তমা কোন কিছুতেই তেমন আগ্রহ দেখায় না। কখনো যদি দেরি করে ফিরি, ও কোনদিনই জিজ্ঞেস করে না দেরি হলো কেন ? অথবা ফেসবুকে কোন সুন্দরী মেয়ে যদি গদ গদ হয়ে কোন কমেন্টস করে, তমা কিছুই বলে না। একবার এক ছাত্রীর বড় বোন আমার একটি প্রোফাইল ছবিতে কমেন্টস করলো ‘স্যার, ইউ আর সো হ্যান্ডসাম, এজ লাইক হৃত্বিক রোশান !’ আমি আমার সিনা টান টান করে তমাকে দেখলাম, দেখ দেখ আমার কতো বড় এডমায়ারার? ও চোঁখ তুলে একবার দেখে বললো, রিপ্লাই দিয়ে দাও, তোমাকেও কারিনা কাপুর লাগছে।
যাচ্ছলে, কোথায় ভাবলাম ও জ্বলে পুড়ে আমার সাথে ঝগড়া করবে, এই মেয়েটা কে জানতে চেয়ে হাজারটা প্রশ্ন করবে, কিছুই হলোনা। ও ভাবলেশহীন ভাবে নতুন একটি ড্রেসের রিভিউ দেখতে লাগলো।
যাই হউক, অনেক কথা বলে ফেললাম। আসলে শেয়ার করার তেমন কেউ নেই তো, তাই আপনাদের বলা। চায়ের পর্বটা শেষ করে ফেলি। কই গো চা খাবে …?





