‘ইতিহাসের শুকনো পাতায় বিজয়িনী লীলা নাগ’ – শামীমা এম রিতু।
রত্নগর্ভা সিলেট!প্রকৃতির সৌন্দর্যের সমারোহে আধ্যাত্মিকতায় মোড়া শত শত অলি আউলিয়ার বিচরণস্থল,শ্রী চৈতন্যের আবাস ভূমি সুরমা,মনু ,কালনী, খোয়াই, ধলাই,বিবিয়ানা,গোপলা,কুশিয়ারা,সারী হাওর বিলে টিলা পাহাড়ে সমৃদ্ধ এই প্রাচীন ভ‚-খন্ডের বুকে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য জ্ঞানীগুণী মহাত্মা আর যুগান্তকারী জ্ঞানের বাতিঘর-আলোকিত মানুষ!যাদের গৌরবময় বিচরণ ধন্য করেছে বাঙালি জাতি,জাতীয়তা আর ইতিহাস কে।ঐতিহাসিকমতে বিশ্বের প্রাচীন নারীরাজ্য ছিল এই শ্রীহট্টেরই জৈন্তিয়া।প্রতাপশালী রানী জয়ন্তীর নামে যার নাম! প্রাচীন শ্রীহট্ট নামেই ছিল নারীর প্রাধান্য। হিন্দুমতে, সীতাদেবীর খন্ডিত হস্ত থেকেই ‘শ্রীহস্ত-পর্যায়ক্রমে শ্রীহট্ট হয়ে জালালাবাদ তারপর সিলেট’! সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই পূণ্যভূমি যে ধরার বুকে কীর্তি স্থাপন করে চলেছে তারই ধারাবাহিকতায় এই ভূমিতেই জন্ম নিয়েছিলেন *‘ভারতবর্ষের তিন লীলা’র একজন বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত, আধুনিক নারী শিক্ষার অন্যতম পথ প্রদর্শক প্রথম বাঙালি নারী সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী এবং প্রথম এমএ ডিগ্রিধারী বিপ্লবী অগ্নিকন্যা লীলা নাগ।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :
লীলা নাগের প্রকৃত নাম ছিল শ্রীমতি লীলাবতী নাগ। পোশাকী এই নামে লেখালেখি করলেও পরে শুধু লীলা নাগ নামে পরিচিত হন এবং ১৯৩৯ সালে আজীবন সহযোগী,সহপাঠী বিপ্লবী অনিল চন্দ্র রায়ের সাথে বিয়ের পর থেকে তিনি ‘লীলা রায়’ নামেই সর্বজনবিদিত ছিলেন। পিতা গিরিশ চন্দ্র নাগের চাকরি সূত্রে বাস ছিল আসামের গোয়াল পাড়ায়। দুই শতাব্দীর অনুপম মিলনলগ্নে সেখানেই ১৯০০ সালের ০২ অক্টোবর বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা হিসাবে ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসেন ‘বুড়ি’। গিরিশ চন্দ্রের পৈতৃক নিবাস ছিল মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও গ্রামে। পরবর্তীতে এই বুড়িই লীলা নাগ হয়ে উঠার পেছনে পরিবারই পালন করেছিল সব থেকে প্রধান ভূমিকা।
লীলার মাতা ছিলেন কুঞ্জলতা দেবী। কুসংস্কারমুক্ত,শিক্ষিত দেশপ্রেমী এই গৃহিণী রত্নগর্ভা মায়ের হাতেই লীলানাগ গান-বাজনা,গৃহস্থালীর কাজকর্ম ,হস্তশিল্প এবং সমাজকর্মের দীক্ষা নেন।কালের প্রথা এড়িয়ে মূলত তিনিই লীলাকে দূরে পাঠিয়ে পড়ালেখার পথ প্রশস্ত করেন। নিয়ম ভেঙ্গে এই কুলবধূই উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন ‘মেয়ে উচ্চ শিক্ষা-দীক্ষায় বড় হয়েছে,সে স্বাধীনমত যখন ইচ্ছে বিয়ে করবে’। এছাড়াও বহু বিপ্লবীকে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন তিনি। উল্লেখ্য যে কুঞ্জলতা দেবী ছিলেন শ্রীহট্টের প্রথম ‘রায় সাহেব’,আসামের প্রথম বাঙালি সুপারিনটেনডেন্ট ব্রাহ্মসমাজ ভুক্ত তেজস্বী পুরুষ সিলেটের প্রকাশচন্দ্র দেবের একমাত্র কন্যা।যিনি চাকরিজীবনে কখনই কোন সাহেবকে বাড়ি গিয়ে সালাম প্রদান করেন নি এবং হিন্দু ধর্ম মতে কন্যাও সম্প্রদান করেন নি। গিরিশ ও কুঞ্জলতার বিয়ে ছিল তৎকালীন সামাজিকতার পরিপন্থী। প্রকাশচন্দ্র দেব অবসরগ্রহণের পর গিরিশচন্দ্রের বাড়িতেই ছিলেন এবং গিরিশ চন্দ্র সরাসরি ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ না করলেও বাস্তবিক জীবনে এবং নাতনী লীলার জীবনে প্রকাশচন্দ্রের বিশেষ প্রভাব ও ভ‚মিকা ছিল। লীলালাগের অন্য তিন ভাই নির্মল, সুশীল ও প্রভাত তিনজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ছিলেন এবং কারাবরণও করেছিলেন। নির্মল ও সুশীল অধ্যাপক ছিলেন এবং প্রভাতকুমার নাগ ছিলেন আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক।
লীলানাগের ঠাকুরদা গিরিশ চন্দ্র নাগের পিতা গঙ্গাগোবিন্দ নাগ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী ‘সম্বাদ-ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক সংস্কৃত পন্ডিত গৌরীশংকর ভট্টাচার্যের সমসাময়িক এবং গৌরিশংকর ছিলেন এই পাঁচগাও গ্রামেরই সন্তান। ফলে সমাজ সংস্কারের প্রভাব সরাসরি গঙ্গাগোবিন্দ এবং তাঁর পরিবারেও পড়েছিল। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চল অবকাঠামোগতভাবে তুলনামূলক অনুন্নত হলেও শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল অনেক অগ্রগামী। গঙ্গাগোবিন্দ নাগ গিরিশ চন্দ্রকে প্রথমে টোলে পড়ালেও পরবর্তীতে কার্যকরী ও আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগের জন্য কলকাতাতে প্রেরণ করেন।
গিরিশ চন্দ্র কলকাতাতে পড়ার সময় বিপিন চন্দ্র পাল, সুন্দরী মোহন দাস,সীতানাথ দত্ত,তারা কিশোর চৌধুরী প্রমুখ প্রখ্যাত মনীষীদের দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত হন। পরীক্ষায় সবসময়েই প্রথ স্থান অধিকারী গিরিশচন্দ্র ১৮৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রথম শ্রেণিতে আইন পাশ করে আইন ব্যবসায় জড়িত হন । কিন্তু কিছুদিন পরেই আসাম সিভিল সার্ভিসে যোগদান করে ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। মহকুমার সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গিরিশচন্দ্র বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে স্বদেশী সহ স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। মাতৃভ‚মির টানে তার বাড়ি পরিণত হয় বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে। তাঁর বাসাতেই বিপ্লবী অনিল দাস বিপ্লবের দীক্ষা নিয়েছিলেন।১৯১২ সালের ১২ ডিসেম্বর লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর বোমা নিক্ষেপকারী বিখ্যাত বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে তিনিই কৌশলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাই সাঁজিয়ে জাপান পাঠাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইন অনুযায়ী প্রথম ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভায় সদস্য মনোনীত হন কিন্তু ভারতীয় সরকারের লবন করের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৮৭৪ সালে সিলেট কে ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে অসমীয়া সমাজ,শিল্প ও সংস্কৃতির চাপে স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হয় ,মূলত তখন থেকেই সিলেটের বঙ্গভুক্তির আন্দোলন শুরু হতে থাকে এবং সিলেটের জনমানসে জেগে উঠা স্বাতন্ত্রবোধের প্রভাবে সিলেটীরা অন্তর্মুখী হতে থাকেন। বৃহত্তর সিলেট জেলার পশ্চাৎপদতার সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই তিনি সিলেটের বঙ্গভুক্তি আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।লীলা নাগের সমুদয় সামাজিক সংঘঠনের অর্থের যোগানদাতা ছিলেন তিনি।একামাত্র মেয়ে উচ্চ শিক্ষিতা হয়ে চাকুরির পরিবর্তে দেশকর্মী হওয়ার ইচ্চাকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন বলেই তিনি পুলিশ কমিশনার কোঠামকে স্বগর্বে বলেছিলেন ‘মেয়ে দেশের কাজ করছে’।
শুধু দেশের স্বদেশী আন্দোলনে নয় নিজ জন্মস্থানের উন্নতিতেও গিরিশ চন্দ্রের বিশেষ ভ‚মিকা ছিল।পাঁচগাও-ফতেহপুর-বালাগঞ্জ রাস্তা, পাঁচগাও-দেবীপুর-ক্ষেমসহ¯্র রাস্তা, পাঁচগাও ডাকঘর, পাঠশালা -‘রায় বাহাদুরের পাঠশালা’বলে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীতে সেটি ‘কুঞ্জলতা প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এ পরিণত হয়। সরকারি চাকরির পর গিরিশচন্দ্র ছোট ছোট জমিদারিও কিনেছিলেন, যার দায়িত্বে ছিলেন কাকা রামতারক নাগ, সুধীর নাগ এবং নায়েবরা। উল্লেখ্য যে সুধীর নাগও দুধর্ষ বিপ্লবী ছিলেন এবং বিপ্লবীদের বিভিন্ন কৌশলে সাহায্য সহযোগিতার কাজ করতেন। এসকল জনহিতকর কাজে রাজকিশোর চক্রবর্তী,অবনীকুমার ভট্টাচার্য,সত্যরঞ্জন রায় ,স্বরাজ কুমার দাস,গিরিশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সহ অনেকে সহযোগিতা করেন। যদিও এ সম্পত্তির সঠিক পরিমাণ ও জমির হিসাব পাওয়া সম্ভব না হলেও পাঁচগাও-মনুমুখ-দত্তউড়া-ডেফলউড়া অঞ্চল পযন্ত বিস্তুৃত ছিল তা বলা যায়।
চাকুরিসূত্রে গিরিশচন্দ্র বিভিন্ন স্থানে বসবাসের পর ১৯১৬ সাল থেকে ঢাকার বকসিবাজারে স্থায়ী হন এবং ঢাকার সমাজে গঠনমূলক সমাজ চিন্তার ধারক-বাহক হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি পান। সামাজিক ভ‚মিকার জন্য তিনি ‘মেম্বার অব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোট’ নির্বাচিত হন।১৯৩৯ সালের ২৪ আগস্ট এই মহান দেশপ্রেমিক রায় বাহাদুর গিরিশ চন্দ্র নাগ পরলোক গমন করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর (০৬ আশ্বিন ১৩৩৯ বাংলা) নিজ জন্মভূমি পাঁচগাও গ্রামে তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হয়।
শিক্ষা জীবন : বিপ্লবের দীক্ষা
পিতার কর্মস্থল আসামের গোয়াল পাড়ায় পাহাড়ঘেরা বাঙালি বিচ্ছিন্ন অসমীয় পরিমন্ডলে লীলা নাগ তার মাতা কুঞ্জলতা এবং মাতামহ প্রকাশচন্দ্রের কাছে বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করে কিছুদিন দেওঘরের এক পাঠশালায় গমন করেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই কলকাতা ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে ভর্তি হন এবং প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।১৯১১ সালে ইডেন হাই স্কুলে ভর্তি হলে জীবনের শুরুতেই তিনি পরিবার থেকে বর্হিমুখী হয়ে পড়েন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি হোস্টেলে থেকেই পড়াশুনা করেন। তৎকালীন সময়ে সকল প্রকার জড়তামুক্ত মেয়ে হবার কারণে ইডেন হাই স্কুলের শিক্ষকরা সহজেই তাকে নারী নেত্রীর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ সময় কালেই রবিঠাকুরের নোবেল জয়, যুগান্তর-অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ ও রুশ বিপ্লবের ঘটনা কিশোরী লীলার মনে বিশেষ প্রভাব ফেলে। ১৯১৭ সালে প্রবেশিকা/ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন।
১৯১৭ সালে লীলানাগ বাংলার নারী অধিকার ও নারী রাজনীতির অন্যতম সূতিকাগার কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। বিখ্যাত নারী বিপ্লবী কামিনী রায়,অবলা বসু ছিলেন এই কলেজেরই বিদ্যার্থী। আইএ পড়ার সময় তিনি কলেজের সিনিয়র স্টুডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়,রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের স্নেহাশীষ লাভ করেন। ১৯১৯ সালে এখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন এবং মাসিক ২০ টাকা বৃত্তি পান। পরবর্তীতে সেই টাকা তিনি শিক্ষার প্রসারে ব্যয় করেন।
১৯১৯ সালে এই বেথুন কলেজেই লীলানাগ ইংরেজি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন।এ সময়ে তিনি নিজেকে আরো ফুটিয়ে তুলেন এবং বিপ্লবী চেতনাও জাগ্রত হতে থাকে। যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো –
· কলেজের কাজকে গতিশীল করার জন্য ‘ছাত্রী ইউনিয়ন’ নামে সংগঠন গঠন।
· কলেজের পূর্বতন ছাত্রীদের সাথে যোগযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ‘রি-ইউনিয়ন’ নামক সামাজিকতার প্রবর্তন।
(বর্তমানে ‘রি-ইউনিয়ন’ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয়।যার প্রথম প্রবর্তক ছিলেন লীলা নাগ)
· কলেজের বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বড়লাট পতœীকে ছাত্রীদের নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানানোর অপমানজনক প্রথার বিলুপ্তিতে প্রধান ভূমিকা রাখা।মূলত তাঁর প্রতিবাদেই এই অপমানজনক রীতি বিলুপ্ত হয়। সেদিন অসহযোগে প্রবলভাবে আলোড়িত লীলা নাগ জুনিয়রদের উদ্দেশ্যে দ্বার্থ্যকণ্ঠে বলেছিলেন-‘পড়াশুনা বা কলেজ ছেড়ে দিলেই স্বাধীনতা আসবে না।’ উল্লেখ্য যে, লীলানাগের বয়স ছিল তখন মাত্র সতেরো বছর।
১৯২১ সালে মেয়েদের মধ্যে ইংরেজি অনার্সে প্রথম বিভাগে বিএ পাশ করেন। পুরস্কার হিসাবে লাভ করেন পদ্মাবতী স্বর্ণপদক সহ নগদ একশ টাকা। পরের ঘঠনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেনন,আইনি জটিলতা সহ বিভিন্ন কারণে ফাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ শিক্ষার নিয়ম ছিলনা। লীলা নাগ প্রবল ইচ্ছা শক্তি এবং সাহসিকতায় সকল বাধা উপেক্ষা করে ১৯২১-২৩ সেশনে নক প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসাবে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অনন্য ইতিহাস স্থাপন করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর ,ভর্তির সিরিয়াল নাম্বার ছিল ২৫, নাম লেখা ছিল – লীলাবতী নাগ।আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সহজ মনে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসাবে লীলানাগের ভ‚মিকা ছিল যুগান্তকারী এবং এর প্রভাব এখনো সুদূরপ্রসারী।তারপরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ছাত্রী হিসাবে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন সুষমা সেনগুপ্ত। ১৯২৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে এমএ পাশ করেন।
বিপ্লবী জীবন :
লীলানাগের রক্তেই মূলত মিশে ছিল বিপ্লবের প্রেরণা। পাবিারিক ভাবেই লাভ করেছিলেন দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার স্পৃহা। কালক্রমে সেই স্পৃহাই দুধর্ষ বিপ্লবে পরিণত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। এমএ, ইংরেজি প্রথম বর্ষের ছাত্র অনিল রায়ের সাথে লীলার পরিচয় বিপ্লবী জুটিতে পরিণত করে এবং পরবর্তীতে একডোরেই জীবন অতিবাহিত করেন।অনিল রায়ের কর্মকৌশলে লীলানাগ ক্রমেই তার কর্মপ্রবাহ সক্রিয় করে তোলেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘শ্রীসংঘ এবং বিখ্যাত দীপালী সংঘ’। প্রথা ভেঙ্গে বিপ্লবী দলে যোগদান করেন। ১৯২৩ সালে সুষমা সেনগুপ্তকে সাথে নিয়ে গঠন করেন দীপালী সংঘ। ঢাকার বকশীবাজারের বাড়ি থেকেই এর কার্যক্রম শুরু হয়। তাদের সাথে ছিলেন – ঠাকুর পরিবারের ইলা রায়, ব্যরিস্টার পিকে বসুর কন্যা কমলা বসু ও মনোরমা বসু,আচার্য ডা. নেপাল রায়ের কন্যা লতিকা রায় ও লীলা রায়,অধ্যক্ষ অপূর্বচন্দ্র দত্তের কন্যা বীণা দত্ত এবং অমলচন্দ্র বসুর স্ত্রী শ্রীমতি সরোজ বসু। ঢাকার মহিলা সমাজে দীপালী সংঘের প্রভাব ছিল ব্যাপক। যেমন,
· ঢাকায় ১৯২৩ সালে দীপালী হাইস্কুল নামে একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিন বছর বিনা বেতনে শিক্ষাদান করেন। বর্তমানে এটি কামরুননেসা হাই স্কুল নামে পরিচিত।১৯২৪ সালে আরেকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন যার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি।
· ১৯২৮ সালে স্থাপন করেন ঢাকার বিখ্যাত নারী শিক্ষা মন্দির।যা বর্তমানে শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিত।পরে বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয় ,শিক্ষায়তন ,শিক্ষা ভবন সহ বেশ কয়েকটি হাইস্কুল সহ ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
সেই সাথে বয়ষ্ক শিক্ষাকেন্দ্র সহ দীপালী ভান্ডার,ছাত্রীনিবাস, ব্যয়ামাগার, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল,নারী রক্ষা ফান্ড সহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।১৯২৬ সালে দীপালী সংঘের অংশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন দীপালী ছাত্রী সংঘ।সাথে ছিলেন প্রীতিলতা,রেণুকা সেন,হেলেনা দত্ত,অশ্রুকনা সেন প্রমুখ।দীপালীর এ প্রীতিলতাই বিখ্যাত নারী বিপ্লবী,চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুষ্ঠনে মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রæয়ারি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় দীপালী সংঘের কার্যকলাপে মুগ্ধ হয়ে লীলা নাগকে ‘শান্তি নিকেতন’ এ আসার আহ্বান জানান।এ প্রস্তাব কিছুটা গর্বিত হলেও স্পষ্টবাদী, নিজ নীতিতে অটল লীলা নাগ সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলন এবং গোপন বিপ্লবী সংগঠন – দু’দিকেই লীলা নাগ ছিলেন সমান পারদর্শী। ১৯২৮ সালে অনিল ও লীলা শ্রীসংঘের বিস্তারের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেন। মৌলভীবাজারে মনমোহন ভট্টাচার্য,অনিল দাস ,নরেশ সূত্রধর,সূর্যমণি দেব,শশীন্দ্র দত্ত অজিত দত্ত , সুকুমার নন্দী, (লীলানাগের ভাইপো) সুধীর নাগ, সিলেটে ফনীন্দ্রনাথ দত্ত ,অমিয়মাধক গুপ্ত, নরেশ চক্রবর্তী ,সত্যব্রত দত্ত, বিনয় মজুমদার ,রথীন্দ্রনাথ দত্ত সহ প্রমুখ ছিলেন শ্রীসংঘের প্রাণপুরুষ। স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনগর অঞ্চলের অনে তরুণ সশস্ত্র বিপ্লবে জড়িয়ে পড়েন। মূলত ,রাজনগর-পাঁচগাও অঞ্চল কর্মকারদের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এবং তাদের তৈরি অস্ত্র বিপ্লবীদের জন্য বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।
১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে যুব বিদ্রোহ ও অস্ত্রাগার দখলের ফলে ব্রিটিশ সরকারের ভীত নড়ে উঠে। অন্যতম শিষ্যা প্রীতিলতার আত্মত্যাগ এবং অনিল রায়ের কারাবরণ লীলা নাগকে একই সাথে ব্যাথিত এবং কর্মস্পৃহা আরো বাড়িয়ে দেয়।গৌরী চৌধুরী, সরবালা দেবী,রেণু সেন,নির্মলা ঘোষ,শকুন্তলা দেবী,ঊষা রায়,সুরমা দাস,ঝুনু বসু,অশোকা গুহ, লাবণ্য দাশগুপ্ত, আশালতা দাসগুপ্ত, প্রমীলা গুপ্ত ,আশা রায়,নীলিমা বসু ,প্রভা দে সহ অনেকে নারী বিপ্লবী লীলা নাগের সহযোগী হিসাবে সাহসী ভ‚মিকা পালন করেন।এদের সকলের সাহসী কার্যকলাপে অস্ত্র সংগ্রহ এবং সেগুলোর আদান-প্রদান, শ্রীসংঘ সংগঠন পরিচালনা সহ যাবতীয় সবকিছু লীলা নাগ একাই সামলিয়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো –
· ১৯৩১ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার সবজি মহল ডাক লুঠ।
· ১৯৩১ সালের ২৮ অক্টোবর ম্যাজিস্ট্রেট ড্রুনোর উপর আক্রমণ।
· ১৯৩১ সালের ০৮ ডিসেম্বর দুধর্ষ রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান এবং প্রখ্যাত বিপ্লবী বিনয়-বাদল-দীনেশের শহীদ হওয়া।
· ১৯৩১ সালের ০৯ মে শ্রীহট্ট মহিলা সংঘের সুরমা উপত্যাকা সন্মেলনে যোগদান এবং সুভাষ বসু, জ্যের্তিময় গাঙ্গুলি ঊর্মিলা দাস প্রমুখের সামনে অগ্নিঝরা ভাষণ প্রদান।
· ১৯৩১ সালের ২৫ জুন তৃতীয় সুরমা উপত্যাকা যুব সন্মেলনে অংশগ্রহণ এবং বিপ্লবী ভাষণ প্রদান।
· একই সময়ে কমলগঞ্জের ভানুবিলে মণিপুরি কৃষক বিদ্রোহে সমর্থন প্রদান।
· বিনোদ ভট্টাচার্য,অনিল দাস,সুধীর নাগ, অমিয়মাধব গুপ্ত,সুকুমার নন্দী, হীরালাল দাস প্রমুখের অংশগ্রহণে সিলেট-লামাকাজি রেল ডাক লুঠ। এ ঘঠনায় হীরালাল দাসকে ধরিয়ে দেবার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করা হয়। অনিল দাস রেঙ্গুনে পালিয়ে যান এবং তড়িৎবুদ্ধি সম্পন্ন সুধীর নাগ কৃষকের ছদ্মবেশে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে ধরা পড়েন এবং ১০ বছর জেলজীবন কাটান।
উল্লেখ্য যে, লীলানাগের বিপ্লবী কার্যাবলি ঢাকা থেকে পরিচালিত হলেও বৃহত্তর সিলেট- মৌলভীবাজার অঞ্চলে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম। এ অঞ্চলের তৎকালীন প্রতিটি বিপ্লবী কার্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিনি জড়িত ছিলেন এবং ঢাকায় বসবাস করলেও পিতৃভূমিতে তার প্রভাব কখনোই কম ছিলনা।সকলেই তাকে স্নেহ করতেন-ভালবাসতেন এবং আপন মনে করতেন।তাঁর সহযোগী অসংখ্য বীর বিপ্লবীরা ইতিহাসের আলোর নীচে শায়িত হয়ে আছেন।
সাংবাদিকতা ও কারাবরণ : গৌরবময় জয়শ্রী’র প্রকাশ
প্রকাশ্য রাজনীতি ও সশস্ত্র বিপ্লবের সাথে সংযুক্ত থেকেও লীলানাগ সাংবাদিকতা কে লালন করেছিলেন হৃদয়ে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটলেন উপমহাদেশে প্রথম নারী মুখপত্র ‘ মাসিক জয়শ্রী’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। যার প্রদাস উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এর সরাসরি সমর্থক এবং ‘জয়শ্রী’ নামকরণ তিনিই করেন। উপমহাদেশে নারী সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা ‘ মাসিক জয়শ্রী’র মাধ্যমে লীলানাগ প্রথম বাঙালি নারী সাংবাদিক হিসাবেও ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সহ সম্পদক ছিলেন যৌথভাবে শকুন্তলা দেবী এবং রেণুকা সেন, প্রকাশক -সুধীর কুমার নাগ। এর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদপট আঁকেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী – শিল্পাচার্য শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু।
সেসময় জয়শ্রীর ক্ষুরধার সম্পাদকীয় মন্তব্যগুলোই ছিল সরকারের জন্য বজ্রাঘাততুল্য। ফলে প্রকাশের অল্পদিনেই লীলানাগ গ্রেফতার হন এবং সহকর্মীরা জয়শ্রীকে সুন্দর ভাবে পরিচালনা করেন।
বিজয়িনী নাই তব ভয়,
দুঃখে ও বাঁধায় তব জয়।
অন্যায়ের অপমান
সম্মান করিবে দান
জয়শ্রী’র এই পরিচয়।
জয়শ্রীর ২য় বর্ষের ১ম সংখ্যা যখন রবি ঠাকুরের আর্শীবাদ বাণী নিয়ে প্রকাশিত হয় ,কবিগুরুর ‘বিজয়িনী’ তখন জেলে। জয়শ্রীতে কবিগুরুর সরাসরি সমর্থন থাকায় সব সংখ্যাতেই তাঁর কোন না কোন লেখা প্রকাশিত হতো। এই ‘জয়শ্রী’তেই দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক লিখিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নটীর পূজা’র গান গুলোর স্বরলিপি প্রথম প্রকাশিত হয়। সে সময়কার সচেতন সাহিত্য ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,ড,রমেশ চন্দ্র মজুমদার (ঐতিহাসিক), বিনয় সরকার,ড. মেঘনাদ সাহা,আশাপূর্ণা দেবী,অমলেন্দু দাসগুপ্ত,মৈত্রেয়ী দেবী,জীবনানন্দ দাস, প্রমুখ জয়শ্রীতে নিয়মিত লিখতেন। যখনি জয়শ্রীর জয়জয়কার চারদিকে তখনি রাজরোষের কারণে ১৯৩১ সালের ২৮ অক্টোবর পুলিশী অভিযানে বন্ধ হয়ে যায় জয়শ্রীর প্রকাশ।
১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর গ্রেফতার হন লীলানাগ। সৃষ্টি হয় আরেক ইতিহাস। কেননা তিনিই হলেন ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক প্রথম নারী। ১৯৩২ সালে শ্রীসংঘের বিপ্লবীরা অপারেশন থেকে ফেরার পথে উন্মত্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অনিল দাস। জেলে থাকা অবস্থায় পুলিশের অত্যাচারে অনিল দাসের নির্মম মৃত্যু সংবাদ তাকে শোকে অধীর করে তুলেছিল।সুদীঘয় কারাজীবনে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ পাহারায় ছিলেন তিনি। এ সময়েই তার সঙ্গী ছিল ‘মহুয়া’ ,রবিঠাকুরের বই এবং সেতার। অত্যন্ত চমৎকার সেতার বাজাতে জানতেন লীলা নাগ। টানা ৬ বছর কারাভোগের আলোর মুখ দেখেন লীলানাগ। তিনি তখন বিপ্লবীদের কল্পলোকের রানী। কবিগুরু, সুভাস বসু সহ অনেকেই আশীর্বাদ পাঠালেন। কিছুদিন বৃদ্ধ পিতা মাতার কাছে কাটিয়ে আবারো নামলেন বাইরে।১৯৩৮ সালে পুনরায় সকলের আনন্দবার্তা নিয়ে মাসিক জয়শ্রী পুনরায় প্রকাশিত হয় এবং রাজনৈতিক ও বিপ্লবী কার্যকলাপ আরো প্রসারিত হতে থাকে। এ সময়েই অনিল রায়ের সাথে পূর্ণ ঘনিষ্টতা বাড়ে এবং ১৯৩৯ সালে অনিল চন্দ্র রায় এবং লীলানাগ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর থেকেই তিনি লীলা রায় নামে পরিচিত হন।
শেষ জীবন : সংগ্রাম ও মৃত্যু
একজন বাঙালি নারী হিসাবে লীলা রায় এবং অনিল রায়ের সংসার জীবন একগেয়ে ছিল না। রাজপথ ই ছিল তাদের জীবন ও কর্ম। প্রথমে আজীবন উৎসাহদাতা ও পৃষ্টপোষক পিতা -মাতার মৃত্যু ,পরে ১৯৫২ সালের ০৬ জানুয়ারি আজীবন সহযোগী, সকল কাজের সাথী-স্বামী অনিল রায় ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হলে নিঃসন্তান লীলা রায়ের জন্য সেটি ছিল অসহনীয় আঘাত। সংসার জীবনে তিনি একা হয়ে পড়লে পাশে দাড়ান সব সময়ের সহযোগী ভাইপো সুধীর নাগ। তাকে সাথে নিয়েই ভগ্ন হৃদয়ে চালিয়ে গিয়েছেন দেশমাতার সংগ্রাম। ১৯৪৭ এর দেশভাগ তাকে অত্যন্ত ব্যাথিত করে ,তিনি এর বিরোধীতা করেন এবং ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনি সরাসরি পাকিস্থান সরকারের সমালোচনা করেন।১৯৫৩ সালে কলকাতা মুসলিম হলের সংযুক্তি সন্মেলন ,এলাহাবাদ সন্মেলন সহ বিভিন্ন সন্মেলনে তিনিই প্রধান হিসাবে বিপ্লবীদের পরিচালনা পথ দেখিয়েছেন। দ্বার্থ্যকণ্ঠে তিনি ঘোষনা করেছেন- ‘আমি চাই আমাদের দেশকে আমরা উন্নত করবো ,অন্য দেশের অনুলিপি হিসাবে নয়, নিজেদের বলিষ্ট চাহিদা ,সম্ভাবনা ,রুচি ও প্রয়োজন অনুসারে। ১৯৬০-৬৩ সালে রাজ-সামাজিক কাজে তিনি একাগ্র ছিলেন, গুরুত্ব ছিল কুটির শিল্পের উপর। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাকে আরো আহত করে।পূর্ব বাংলা বাঁচাও -আন্দোলনে তিনি আইন অমান্য করে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে জীবনের শেষ বারের মত কারাবরণ করেন। সমস্ক অসুস্থতা উপেক্ষা করে দিল্লি পার্লামেন্ট ভবনের সামনে সত্যাগ্রহ অনশন কর্মসূচী তার মাধ্যমেই সফলতা লাভ করেছিল। মানবতা রক্ষায় এটিই ছিল লীলা রায়ের শেষ প্রতিবাদ।
অনেক বছরের টানা পরিশ্রম ক্রমশ লীলারায় কে গ্রাস করেছিল। সমস্ত দুঃখ, জরা, শোক সমস্ত কিছু দূরে রেখে মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলেন নিজেকেই।১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ প্রায় ৭ বছর দুঃসহ অসুস্থতার সাথে লড়াই করে ১৯৭০ সালের ১১ই জুন রাত ১২টা ২০ মিনিটে ৭০ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন ‘বিংশ শতাব্দীর বিজয়িনী’। শৈশবে ক্ষুদিরাম রায়ের ফাঁসির খবরে কাঁদতে থাকা বাবাকে দেখে যে স্বদেশপ্রীতি-স্বাধীনতা প্রেম মনে জন্মেছিল অর্ধশত বছরের রাজনৈতিক জীবন দিয়ে শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত তা লালন পালন করে যান। শুধু বিপ্লবী মহল নয় স্বাধীনতা কামী সকলেই অঝরে অশ্রুজলে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন তাদের প্রিয় লীলা রায় কে।
ইতিহাসে আজ সেই বিজয়িনী আর অনুসারীরা অনেকটাই বিস্মৃত! বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাসে ঐতিহ্যমন্ডিত নারী শ্রীমতি লীলা রায় কে স্মরণ করি বিন¤্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসায়। আমাদের একালের নারী জগতে তিনি অনন্যা-তিনিই প্রথমা। কোন একদিন ইতিহাসের অতল থেকে বিজয়িনী জীবনান্দ দাসের কবিতার মত আবার ফিরবেন ; সকল অন্যায় দূর করে আবার শ্রী ফিরে আসবে ‘জয়শ্রী’ তে! কাগজের পাতায় তার কীর্তি অংকিত না থাকলেও ইতিহাসের স্রোত ধারায় লীলা রায় কখনোই ভেসে যাবেন না। বিশাল সমুদ্রের বুকে বাতিঘর হয়ে আছেন তিনি আর তাঁর চেতনা ; আমাদের উচিত সেই চেতনা কে খোঁজে নেয়া !
*ভারতবর্ষের তিন লীলা – ১. খনা – লীলাবতী, ২. পন্ডিত ভাষ্করাচার্যের কন্যা,প্রাচীন গণিত শাস্ত্র লীলাবতী অংশের রচয়তা এবং বিপ্লবী লীলাবতী নাগ|
তথ্য সংগ্রহ : লীলা রায় ও বাংলার নারী জাগরণ, মহাশয় দীপংকর মোহন্ত।





