ইসলামে সামাজিক সুরক্ষার তাৎপর্য।
ইসলাম মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব দেয়। কেননা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আবশ্যক হলো সমাজের প্রতিটি সদস্যের জীবনের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। আবার সামাজিক শৃঙ্খলা ছাড়া মানুষের ব্যক্তি জীবনের অগ্রগতি ও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষের মনুষ্যত্বও তত দিন পূর্ণতা লাভ করে না, যত দিন না সে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। যেসব দায়িত্ব আল্লাহর সৃষ্টি ও সমাজের সদস্য হওয়ার কারণে তার ওপর বর্তায়।
অবশ্য এই দায়িত্ব পালনের জন্য সুষ্ঠু সামাজিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক। এ জন্য পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে বিশেষ সম্বোধনের পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। যেমন কোরআনে যেখানে সামগ্রিক সম্বোধন করেছে তখন ‘ইয়া আইয়ুহান-নাস’ হে লোক সকল বলেছে আর যখন বিশেষ সম্বোধন করেছে তখন ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু’ হে ঈমানদাররা বলেছে। একইভাবে ব্যক্তি বিশেষকে সম্বোধনের পরিবর্তে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্বোধনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ গ্রাস কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)
এসব আয়াত দ্বারা বোঝা যায় ব্যক্তিগত জীবন সুসংহত না হলে সামাজিক জীবন সুসংহত করা সম্ভব নয়। একইভাবে ব্যক্তি জীবনের কল্যাণ ও সাফল্য সামাজিক কল্যাণ ও সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘ইসলামে কোনো বৈরাগ্য নেই’।
ইসলাম সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এমন কিছু সামাজিক মূলনীতি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে একদিকে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জীবনধারাকে আল্লাহর আনুগত্য এবং ধর্মের অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের জন্য সার্বজনীন কল্যাণ, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, সাম্য ও সমতা নিশ্চিত করেছে। সেই সমাজব্যবস্থায় এমন সব অন্যায় পদ্ধতি নিষিদ্ধ, যার মাধ্যমে নিন্দিত পূঁজিবাদের বিস্তার ঘটে। যার মাধ্যমে সম্পদ এক শ্রেণির হাতে পূঞ্জিভূত হয় এবং সাধারণ শ্রেণি দারিদ্র্যের শিকার হয়।
তবে ইসলাম সমাজের স্বাভাবিক তারতম্য ও ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করাকে ভুল মনে করে। কেননা এর মাধ্যমে মানুষের কর্মশক্তি নষ্ট করা হয় এবং মানুষের ভেতর স্থবিরতা তৈরি হয়। এমন হলে শ্রমিকরাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যর্থ প্রমাণে তৎপর হয়।
ইসলাম সম্পদ গুদামজাত করা, সম্পদ পূঞ্জিভূত করা এবং জীবনমানে সবার সাম্য নিশ্চিত করে। কিন্তু তা যেন পূঁজিবাদের পক্ষে যুক্তি তৈরি করতে না পারে সে জন্য গুদামজাতের সঙ্গে জনস্বার্থের প্রশ্ন জুড়ে দিয়েছে, সম্পদের ওপর জাকাতের বিধান আরোপ করেছে এবং সাম্যের সঙ্গে সুবিচারের শর্ত আরোপ করেছে।
ইসলাম সামগ্রিক কল্যাণ ও জীবনের মৌলিক প্রয়োজনে সবার জন্য সাম্যকে ইসলামী সমাজব্যবস্থার মেরুদণ্ড ঘোষণা করেছে। কল্যাণ সমাজের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে, যেখানে মানুষ পারস্পরিক অন্ধ প্রতিযোগিতার বিপদ থেকে আত্মরক্ষা করে এবং বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়। খোলাফায়ে রাশেদাসহ পরবর্তী যুগের মুসলিম শাসন তার সাক্ষ্য দেয়। এবং এই অন্তর্নিহিত শক্তির বলে ইসলাম সমকালীন নতুন ও পুরাতন সব জীবনব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়।
লেখক : মুফতি আব্দুল হাশিম।





